পৃথিবী এক সময় আদিম সাম্যবাদী সমাজ ছিল। লাঙ্গল আবিষ্কার হলো, কৃষির প্রচলন ঘটল, সেখান থেকে এলো সামন্ততন্ত্র পৃথিবীকে চমক লাগানো জেমস ওয়াটের স্টিম ইঞ্জিন। বিশ্ব অর্থনীতি ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা কস শোয়াবের মতে, এসব প্রথম শিল্প বিপ্লব।
বিদ্যুৎ, রেডিও, টেলিভিশন এসব দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব।
তারপর ডিজিটাল যুগ ও ইন্টারনেট। এটা তৃতীয় শিল্প বিপ্লব। বর্তমান সময়ের ফেসবুক, টুইটারকে অনেকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ধরলেও অর্থনীতিবিদরা এসবকে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সংস্কার বলে অভিহিত করেন।
২০২৫ সালের মধ্যে পৃথিবীতে কী কী নতুন বাস্তবতা দেখা দেবে, তার একটি তালিকা কস শোয়ায়েব দিয়েছেন। যেমন- ২০২৫ সালের মধ্যে শরীরে মোবাইল ফোন বসানো হবে। এখনকার প্রেসমেকারের মতোই অনেকটা। তাতে আমাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে কিন্তু ক্ষতি হবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের একাধিক ডিজিটাল ঠিকানা থাকবে, তাতে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাড়বে। তেমনি বাড়বে এ সংক্রান্ত অপরাধ, থাকবে চশমার সাথে ইন্টারনেট যুক্ত, পোশাকের সাথে ইন্টারনেট যুক্ত, ‘ইন্টারনেট অব থিংস।’
ইন্টারনেট অব থিংস’ সব জিনিসই ইন্টারনেট যুক্ত থাকবে। এমনকি গবাদিপশু মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করবে।
লোকের শহরে কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল লাগবে না। সব ইন্টারনেটে যুক্ত থাকবে যেমন- চালকবিহীন গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বা, বিটকয়েন ব্লকচেইন। বিকল্প টাকা। ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারের মাধ্যমে মানুষের চিকিৎসা হবে। থ্রি-ডি প্রিন্টারের থেকে নেয়া যকৃত মানুষের শরীরে বসানো হবে। প্রথম মানব শিশু জন্ম নিবে, যার জিনোম কৃত্রিমভাবে উন্নতর করা হয়েছে। তার মানে বোঝা যাচ্ছে, আগামী সাত বছরের মধ্যে পৃথিবীর হাজারও না ঘটা সব বিষয় ঘটতে যাচ্ছে। যার মধ্যে অনেকগুলো বিষয় এখনই চলে এসেছে।
এখন প্রশ্ন হলো- এগুলো পরিবর্তন হলে আমাদের কি হবে?
সত্যি বলতে কি- এখনো আমরা পরিস্থিতিটা বুঝতে পারছি না।
আমাদের দেশে এখন আর গরু গাড়ি চালায় না কিন্তু মানুষ এখনো রিকশা চালায়। সে দেশে গাড়ি চলবে ড্রাইভার ছাড়া, এটা কল্পনাতীত।
পৃথিবীতে পোশাক শিল্পে যদি শ্রমিক না লাগে তাহলে সে কাজ বাংলাদেশ কেন করবে?
আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস প্রবাসী শ্রমিকদের আয়। এখন আমরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে যাচ্ছি গ্যারেজ কিংবা কলকারখানায় কাজ করতে, তখন ওই কাজও তো যন্ত্র করবে।
অটোমেশন সর্বত্র হবে। নির্মাণ খাতেও হবে। মানুষ কাজ হারাবে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে- ২০২৫ সালের মধ্যেই বাংলাদেশে বেকারত্ব বাড়বে, সাথে একটি বিপর্যয়ের পক্ষে যাবে। যদি আমরা এ বিষয়টি মাথায় রেখে না অগ্রসর হই। আগাম প্রস্তুতি না নেই।
পরিকল্পনাবিদদের এ নিয়ে ভাবতে হবে। এ ঝড় মোকাবেলায় কিছু প্রদক্ষেপ নিতে হবে।
- দেশের প্রতিটি নাগরিককে দক্ষ ও শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
বিজ্ঞাননির্ভর উপযোগী শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষার এ জায়গাটা নিয়ে আমাদের ছাত্রদের অনেক দুশ্চিন্তা। প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি, রাজনৈতিক কারণে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্যদের নিয়োগ, ফাঁকি ও কোচিংবাণিজ্য। এসব আমাদের শিক্ষাকে ধসে দিচ্ছে। আফসোস! আমাদের শিক্ষা গবেষকেরা এ নিয়ে ভাবতে চান না। অথচ এই মুহূর্তে এগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভাবা উচিত।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ঝড়ের সাথে এগিয়ে যেতে হলে, আমাদেরকে বিজ্ঞানের আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং নির্ভর হতে হবে ইন্টারনেটভিত্তিক কাজে, বেকারদেরকে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজে লাগাতে দক্ষতারও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষা খাতের উন্নয়ন করতে হবে। তরুণদের মেধাকে কাজে লাগাতে হবে।
এরকম কিছু বিষয় দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নেতিবাচক দিক থেকে বাঁচতে পারি। পাশাপাশি বিপ্লবের পথ ধরে এগিয়ে যেতে পারি ঝড়োগতিতে।
বিশ্ব অর্থনীতি ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা কস শোয়াবের লেখা বই ‘দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন’। বা চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। এ বইটি আমাদের ভাবাচ্ছে। ভাবতে বাধ্য করছে।